• আজ, শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ২ আশ্বিন ১৪২৮ | ৮ সফর ১৪৪৩
logo

চোখের নোংরামি নারী সইবে আর কতদিন!

চোখের নোংরামি নারী সইবে আর কতদিন!

ছোট কোনো মেয়ের সদ্য বাড়ন্ত শরীরের দিকে লোভ নিয়ে তাকাতে দেখেছি অনেক পুরুষকে। লোকাল বাসের ভীড়ে লকলকে চোখে তাকাতে দেখেছি শত শত পুরুষকে। এখন আর চোখের নোংরামি তেমন ভাবায় না। কিছু বলারও থাকে না । বলবো কাকে? কীভাবে বলবো? আমার কাছে তো কোনো প্রমাণ নেই । শুধু চোখের বাজে চাহনি। এর তো কোনো মেডিক্যাল রিপোর্ট হয় না। এর কোনো স্ক্রিন প্রিন্টও রাখা যায় না।

“অশ্লীলতা অতি সহজেই প্রবলবেগে মনকে আঘাত করে, যাদের সময় নেই ও শক্তি কম তাদের পক্ষে অতি দ্রুতবেগে আমোদ পাবার এই অতি সস্তা উপায়। ”

– পথে ও পথের প্রান্তে:৩৩

-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

একবার পৌর মাছ বাজারে এক নারী ম্যাজিসেট্রট মাছ কিনতে এসেছিলেন। তাকে দেখে যথারীতি মাছ বিক্রেতারা নানাভাবে শরীরের বাজে অঙ্গভঙ্গি করছিল। মাছ ক্রেতাদের একজন আলগোছে উনার শরীর স্পর্শ করে চলে যাচ্ছিলো। উনি উপস্থিত সবাইকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিলেন সেদিন।

ছোটবেলা থেকে মা আমাদের ভীষণ আগলে রাখতেন। আত্মীয় স্বজন কারো বাড়িতে বেড়াতে পাঠাতেন না। হয়তো তার মনে কোনো অজানা আশঙ্কা ছিল বলে। তিনি জানতেন মেয়েদের সাথে কী ধরনের সহিংসতা হয়। তিনি আমাদের সবসময় আগলে রাখতেন। একসময় বড় বোন সে দায়িত্ব পালন করতেন। বড় হতে হতে শিখে গেছি কিভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হয়।

রাস্তায় বের হলে চারদিকে তো চোখ খুলেই হাঁটতে হয়। কিছু কিছু চোখের চাহনি ওড়নার ফাঁক ফোকর দিয়ে বিচিত্র কিছু খুঁজতে থাকে। চোখের চাহনির ভেতর শুধু লালসা দেখতে পাই। ইতিউতি করছে চোখ। যেন চোখ দিয়েই ধর্ষণ করে যাচ্ছে । কী বীভৎস! চোখ ফিরিয়ে নিই। সুযোগ পেলে কী করতো জানি না।

রিকশায় উঠে শান্তি নেই। একটু খেয়াল করলেই দেখি রিকশার ড্রাইভার তার রিকশার লুকিং মিরর আমার দিকেই দিয়ে রেখেছে। রিকশা চালানোর ফাঁকে ফাঁকে আমাকে দেখছে, আর আমার শরীর দেখছে। ফাঁকে ফাঁকে লুঙ্গির মধ্যে হাত দিচ্ছে।

একদিন মাকে নিয়ে গেলাম এক ডাক্তারের চেম্বারে। চেম্বারের গেটে দিয়ে ঢুকতেই দেখি কম বয়সী দুজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। তারা শরীরের দিকে চোখ দিয়ে বাজে ইশারা করছে। মাকে চেম্বারে বসিয়ে ঔষধ কিনতে বের হয়েছি, ঠিক তখনি বাজে ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দ কানে এলো। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে দিলাম কষে এক চড়। পরে শুনেছি ছেলেটার চাকরি চলে গেছে।

কাঁচা বাজারের গলির রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় বাজে অঙ্গভঙ্গি করছে এক সব্জি বিক্রেতা। হাতে ছাতা ছিল। ছাতা দিয়ে দিলাম কয়েকটা। কয়েকজন এসে আমাকে থামালো। আপা এসব কইরেন না। মানুষ খারাপ কইবো।

লোক লজ্জার ভয়ে কত মেয়ে চেপে যায় এসব মানসিক নির্যাতন। তাইতো নারীরা নিজেকে গুটিয়ে নেয়। মুড়িয়ে নিচ্ছে বোরকা, আবায়া, হিজাব, নেকাবে। কিন্তু তাতে কি কোনো লাভ হচ্ছে? কোথায় নেই চোখের নোংরামি! ঘরে -বাইরে,রাস্তায়, হাটবাজারে, অফিস- আদালত এমনকি শিক্ষাঙ্গনে। চোখের নোংরামি দেখে চোখ খুবলে দিতে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে।

আর শরীরের বাজে অঙ্গভঙ্গি তা তো আছেই। মেয়েদের দেখলে শরীরের বিশেষ বিশেষ স্থানে হাত নড়াচড়া করা । চুলকানো। এর কোনো প্রতিকার নেই। তীব্র আক্রোশ হয়। হাজার হাজার ঘিনঘিনে চোখ সব জায়গায় ঘুরে বেড়ায় এই নোংরা পৃথিবীতে। ঘরে বাইরে সব জায়গায় এ চোখ থেকে নিস্তার নেই যেন।

শুধু আমি নই। অনেক মেয়েই এই সমস্যায় পড়ে। কেউ মুখ খোলে না। চুপ থাকে চক্ষু লজ্জার ভয়ে। সমাজ, পারিপাশ্বিকর্তার ভয়ে গিলে ফেলে সব অপমান। সমাজের এই ট্যাবু শুধুই কি নারীর জন্য? কেন তারা এ ভ্রান্ত ট্যাবুর জন্য সব মেনে নেবে? কে কী ভাবলো তাই ভেবে অসহনীয় সব বীভৎস আচরণ মেনে নেবে?

একটু চারদিকে চোখ কান খোলা রেখে নজর দিলেই দেখবেন প্রতিনিয়ত নারীর প্রতি এই অন্যায় আচরণ। অন্যায় দৃষ্টিভঙ্গি। প্রায় সব মেয়েরা এসব কারণে কোনো না কোনোভাবে হ্যারাসমেন্টের শিকার হচ্ছে। বাজে শব্দগুলো কানে যেন না আসে তাই অনেকে কানে হেড ফোন গুঁজে রাস্তায় বের হয়।

আগে আমার সাথে অন্যায় কিছু হলে, খারাপ কিছু হলে চুপ করে থাকতাম। ভয় পেতাম পাছে লোকে কিছু বলবে ভেবে। কিন্তু এভাবে চুপ করে থাকা কোনো সমাধান নয়। তাই একটা সময় থেকে প্রতিবাদ করা শুরু করলাম। কোনো অন্যায় মেনে নেয়া, আপোস করা মানেই অন্যায়ের সাথে জীবন যাপন করা। নতুবা এটা একধরনের নিজের সাথে নিজের প্রতারণা।

যে কোনো অন্যায়কে আমরা না বলি না। বিষয়টি নারীর সাথে ঘটে যাওয়া বিষয় হতে হবে এমন না। আমাদের চারপাশে কত অন্যায় সব ঘটনা ঘটে যায়। আমরা দেখেও না দেখার ভান করি। আমরা গা বাঁচিয়ে চলি। নিজের ইমেজ বাঁচিয়ে চলি। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার অভিনয় করি।

মানুষটা ভালো না। মানুষটা অন্যায় করছে জানি, দেখি, তারপরও কিছু বলি না। পাশ কাটিয়ে যাই। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য পাশ কাটিয়ে যাই। অন্যায়কারী ঠিকই আপনি যে মেরুদণ্ডহীন বুঝে যায়। একসময় আপনাকেও সে ছোবল মারে। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিয়ে আপনি নিজেও যে বড় অন্যায় করে ফেলেন।

আমরা আবার আমাদের কাছের কেউ অথবা পরিবারের কেউ অন্যায়কারী হলে, নির্যাতনকারী হলে, নিপীড়ন করলে, তখন আমরা আরো বোবা হয়ে যাই। আমরা তখন অন্যায়কারীর পক্ষে সাফাই গাই। বিষয়টি অন্যায় জেনেও ঘুরিয়ে প্যাচিয়ে অন্যায়কারীকেই সাপোর্ট করি। এ অন্যায় যখন আপনার কাছের কারো সাথে করা হয়, তখন আপনি হয়ে ওঠেন প্রতিবাদী। তাকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য কোমর বেঁধে মাঠে নামেন। তাই সব অন্যায়কে না বলুন।

“সত্যমিথ্যা ভালোমন্দ সমস্ত কিছুকে বিনা প্রশ্নে অলস ভীরু মন যখন মেনে নিতে থাকে তখনই মনুষ্যত্বের সকল প্রকার দুর্গতি।”

– চারিত্রপূজা।

– রাজা রামমোহন রায়।

নারী মানেই লালসার বস্তু নয়। যাকে দেখলে চোখের বাজে চাহনি দিয়ে ইঙ্গিত দিতে হবে। শরীরের নানা বাজে অঙ্গভঙ্গি দিয়ে তাকে অপমান করতে হবে। শরীরের বিশেষ অঙ্গে চুলকোতে হবে? আপনিও তো কারো বোনের ভাই। কারো প্রেমিক। কোনো মায়ের সন্তান। কোনো মেয়ের বাবা। তাই আপনি সংযত হোন।

কিছু কিছু পুরুষগণ বলেন, এসব দেখেও না দেখার ভান করতে হয়। এড়িয়ে যেতে হয়। সব জায়গায় প্রতিবাদ করতে হয় না। তাদের বলছি, নারী হয়ে জন্ম নেয়া কোনো দুর্বলতা নয়। নারী যেন স্বস্তি নিয়ে পথ চলতে পারে, পারলে পাশে থাকুন। হাত বাড়িয়ে দিন। এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করুন। সমাজ কি বলবে এসবের দোহাই দিবেন না। সমাজের এসব ট্যাবু দিয়ে নারীর প্রতিবাদ করার প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াবেন না প্লিজ।

লেখক:
উন্নয়নকর্মী  
ফেসবুক থেকে নেয়া। 

ফিচার

Top